যারা দেশে রেমিট্যান্স পাঠিয়ে দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা থেকেই এ অনুষ্ঠান আয়োজন। সত্যি কথা বলতে কি, আমি নিজেও একজন প্রবাসী ছিলাম। আগাম অবসরে যাওয়ার আগ পর্যন্ত ৩২ বছর দেশের বাইরে ছিলাম। আপনাদের মতোই চেষ্টা থাকত প্রতি বছর দেশে আসার। প্রায় প্রতি বছরই কোনো না কোনোভাবে দেশে এসেছি। দেশের সঙ্গে এ সম্পর্কটা থাকায় ফেরার পর অবসর-পরবর্তী জীবনে প্রবেশে তেমন অসুবিধা হয়নি। রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের ভূমিকা, দেশের প্রতি দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধ আমি ব্যক্তিগতভাবেই অনুধাবন করি।
গত বছর আগস্টে যখন গভর্নর পদে দায়িত্ব পাই তখনই চিন্তা করি কীভাবে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে স্থিতিশীল পর্যায়ে আনতে পারি। তখন মনে হয়েছিল এজন্য দুটো জিনিস দরকার। প্রথমত, ডলারের বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখতে হবে। কেননা অস্থিতিশীল বিনিময় হার দিয়ে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা আনা যায় না। দ্বিতীয়ত, যদি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে চাই তাহলেও বিনিময় হারকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। আর সেটি করতে গেলে রেমিট্যান্স লাগবে। বর্তমানে বাংলাদেশে যে স্থিতিশীলতা দেখছি সেখানে রেমিট্যান্সের ভূমিকা বিশাল, এটি অবশ্যই স্বীকার করতে হবে। সদ্য বিদায়ী (২০২৪-২৫) অর্থবছরে আগের অর্থবছরের চেয়ে ৭ বিলিয়ন ডলারের বেশি রেমিট্যান্স এসেছে। যেটি ব্যাপকভাবে অর্থনীতি স্থিতিশীল করতে সাহায্য করেছে। এক্ষেত্রে প্রবাসীদের অবদান কৃতজ্ঞতাভরে স্মরণ করতে হবে।
গত বছর বৈদেশিক বাণিজ্যে চলতি হিসেবে ঘাটতি ছিল প্রায় সাড়ে ৬ বিলিয়ন ডলার, এ বছর তা ১ বিলিয়ন ডলার উদ্বৃত্তে দাঁড়িয়েছে। গত বছর যেখানে রিজার্ভ ৫ বিলিয়ন ডলারের মতো কমেছিল সেখানে এ বছর ৩-৪ বিলিয়ন ডলার বেড়েছে। আমাদের রিজার্ভ যে নেতিবাচক ধারা থেকে ইতিবাচক ধারায় এসেছে তার মূলে রয়েছে রেমিট্যান্স ও আরএমজি রফতানি। অবশ্য এ দুটোই আমাদের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে। রেমিট্যান্সের দিক থেকে আমরা সবচেয়ে ভালো করেছি এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে রেমিট্যান্সের গুরুত্ব বেশি হওয়ার কারণ, এটির বেশির ভাগই যায় গ্রামীণ অর্থনীতিতে। এটি শহরকেন্দ্রিক নয়, বহুলাংশে গ্রামভিত্তিক। ফলে এর প্রভাব ব্যাপক। রেমিট্যান্স দেশের আর্থিক খাতকে শুধু সাহায্য করছে না, সামাজিক রূপান্তরেও বড় ভূমিকা রাখছে। ফলে কী হচ্ছে? গ্রামীণ অর্থনীতি ভালো হচ্ছে। গ্রামের শিশুরা ভালো শিক্ষা পাচ্ছে। পারিবারিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা, আবাসিক ব্যবস্থার উন্নতি হচ্ছে। এগুলো দৃশ্যমান। আমি শুধু এটুকুই বলব, গ্রামীণ অর্থনীতি এখন সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থানে আছে। রেমিট্যান্সের টাকার বড় অংশই গ্রামীণ অর্থনীতিতে যায়। আমাদের হিসাবে, গত বছরের চেয়ে এ বছর লক্ষ কোটি টাকা বেশি গিয়েছে। গ্রামীণ অর্থনীতির সচ্ছলতা ও গতিশীলতার এটা গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক। ভারত-পাকিস্তানের চেয়ে আমাদের গ্রামীণ অর্থনীতি ব্যাপক শক্তিশালী। তার মূলে রয়েছে আপনাদের রেমিট্যান্স পাঠানোর প্রবণতা।
রেমিট্যান্স নাকি গার্মেন্টস—কোনটি বেশি অবদান রাখে, এখানে সেই প্রশ্ন উঠেছে। সামান্য হিসাব করে দেখলাম, বিদেশে আমাদের ১২ মিলিয়ন তথা ১ কোটি ২০ লাখ প্রবাসী চাকরি করেন। আরএমজি খাতে অফিশিয়ালি বলা হয়, ৪০ লাখের মতো মানুষ যুক্ত। আসলে এ সংখ্যা ৩০ লাখের মতো হবে। এখানে প্রবাসী কর্মী তাদের চেয়ে তিন গুণের মতো। এটি একটি পার্থক্য। আরএমজিতে ৩৯ বিলিয়ন ডলার রফতানি হলেও ২৫-২৬ বিলিয়ন ভ্যালু অ্যাডিশন হয়। আর রেমিট্যান্সের পুরোটাই ভ্যালু অ্যাডিশন হিসেবে যুক্ত হয়।
রেমিট্যান্স থেকে আমরা ৩০ বিলিয়ন ডলার পাচ্ছি। এখানে প্রবাসীদের আরো ভালো করার সুযোগ আছে। আমি মনে করি, ৪৫ বিলিয়নে নিয়ে যাওয়ার মতো সক্ষমতা আমাদের আছে। কিন্তু বিভিন্ন কারণে এটি অন্যদিকে চলে যায়। আপনাদের (প্রবাসী) অনুরোধ করব, একটু সচেতন হোন। আপনারা যদি টাকাগুলো সরাসরি বাংলাদেশী কোম্পানি বা বাংলাদেশী ব্যাংকের সঙ্গে কানেকশন আছে এমন মাধ্যম ব্যবহার করে পাঠান, তাহলে সেটি অন্যদিকে যাওয়ার সুযোগ থাকবে না। এমনটি করলে রেমিট্যান্স আয় ৪০-৪৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা সম্ভব।
প্রবাসীরা রেমিট্যান্স বাড়ানোর চেষ্টা করছেন এতে সন্দেহ নেই। এখানে সরকারেরও কিছু ব্যর্থতা আছে। কিন্তু সামগ্রিকভাবে আমরা দেখি, বাংলাদেশীদের মাথাপিছু আয় অন্যান্য দেশের তুলনায় কম। এখানে আমি সরকারি ব্যর্থতার কথাই বলব। আমাদের মানসিকতার পরিবর্তনও দরকার। আমরা কারিগরি শিক্ষার দিকে না গিয়ে জেনারেল শিক্ষার দিকেই বেশি যাচ্ছি। সেজন্য আমাদের দক্ষতার উন্নয়ন হচ্ছে না। যেটি করলে দ্বিগুণ, তিন গুণ বা ১০ গুণ পর্যন্ত বেতন বাড়তে পারে, সেটি ভাবছি না। আমরা যাচ্ছি অদক্ষ হয়ে, যদিও অনেকেই আইএ, বিএ পাস করা। কিন্তু দক্ষতার উন্নয়ন করে যাচ্ছি না। এ জায়গায় মানসিকতার পরিবর্তন আনতে হবে। যারা প্রবাসে আছেন, তাদের বলব আপনাদের সন্তানকে পড়ালেখা করানোর সময় ভাববেন কোথায় পড়ালে তাদের দক্ষতা বাড়বে। গড্ডলিকাপ্রবাহে গা ভাসিয়ে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াব, সে একটি ডিগ্রি পাবে—এ আশা করবেন না। দুঃখজনক হলেও সত্য, দেশে একজন গাড়িচালক মাসে ৪০ হাজার টাকা আয় করে। কিন্তু একজন বিএসসি বা এমএ পাস ছেলে ২০ হাজার টাকা বেতনের চাকরিও পাচ্ছে না। এটিই বাস্তবতা।
সবকিছু বিবিএ, এমবিএ ডিগ্রি দিয়ে হবে না। এমন কিছু করতে হবে যেটি আমার জন্য ও দেশের অর্থনীতির জন্য ভালো। গড্ডলিকাপ্রবাহে গা ভাসিয়ে লাখ লাখ তরুণ এমএ, বিএ ডিগ্রি নিচ্ছে। এতজনকে তো এ দেশে চাকরি দিতে পারব না। কোনো দেশেই সবাইকে চাকরি দেয়া সম্ভব না। এর বিকল্প কী? কারিগরি শিক্ষার মাধ্যমে দক্ষতার উন্নয়ন হলে চাকরির বিকল্প নানা ক্ষেত্র তৈরি হবে।
ভবিষ্যতে বাংলাদেশীদের জন্য বিদেশে যাওয়ার সুযোগ আরো অনেক বাড়বে। জাপানে এখন বহু মানুষ যেতে পারছে। ভবিষ্যতে চীনেও যেতে পারবে। পূর্ব ইউরোপেও সেই সম্ভাবনা রয়েছে। সেবা খাত পৃথিবীর সবচেয়ে বড় খাত। হোটেল-রেঁস্তোরা, হাসপাতাল, ব্যবস্থাপনা সবই সেবা খাতের অন্তর্ভুক্ত। বাংলাদেশের জিডিপিতে সেবা খাতের অবদান ৫৪ শতাংশ। কিন্তু জিডিপিতে উৎপাদন খাতের অবদান কত? ১৮-১৯ শতাংশ। সেবা খাতে আমাদের সম্ভাবনা ব্যাপক। কিন্তু এত সম্ভাবনার পরও এ খাতে আমাদের দক্ষতা কতটুকু? খুবই কম বা দক্ষতার মান নিম্ন। সেবা খাতের জন্য যদি আমাদের ছেলেমেয়েদের উৎসাহিত করতে পারি, তাহলে আয় ব্যাপক বাড়বে। এটি করলে নিজের ও দেশের জন্য ভালো হবে।
মাথাপিছু আয় বাড়াতে হলে পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তিন পক্ষের সমন্বয় হলে তবেই আমরা রেমিট্যান্সের প্রবাহ দীর্ঘস্থায়ী ও দীর্ঘমেয়াদি করতে পারব এবং মাথাপিছু আয় দুই-তিন গুণ বাড়াতে পারব।
ফিলিপাইনের মাথাপিছু আয় আমাদের চেয়ে তিন গুণ। কারণ তারা ভাষায় দক্ষ। বিশেষ করে ইংরেজি খুব ভালোভাবে পারে। আমি যুক্তরাষ্ট্রে যখন কাজ করেছি, বিশ্বব্যাংকসহ বিভিন্ন বড় প্রতিষ্ঠানে প্রশাসনিক সহকারী হিসেবে সবচেয়ে বেশি কাজ করতে দেখেছি ফিলিপাইন নাগরিকদের। এটি খুবই আকর্ষণীয় চাকরি। কিন্তু এখানে দক্ষিণ এশীয়দের উপস্থিতি তেমন নেই। সেবা খাতে আমরা শিক্ষা ও মানসিকতার কারণে পিছিয়ে যাচ্ছি। বিশ্বব্যাপী নার্সিংয়ের ব্যাপক কদর রয়েছে। কিন্তু আমাদের দক্ষ নার্সের অভাব রয়েছে।
শিক্ষা ও মানসিকতার কারণে আমরা সেবা খাতে পিছিয়ে আছি। কিন্তু এক্ষেত্রে যদি আমরা পিছিয়ে পড়ি, জাতি হিসেবে উন্নতি করতে পারব না। নার্সিংয়ে আমাদের কোনো অবদান নেই। বিশ্বব্যাপী নার্সের ব্যাপক চাহিদা। কিন্তু আমাদের কোনো সরবরাহই নেই। নার্সিংকে আমরা অন্য চোখে দেখি। এসব ক্ষেত্রে আমাদের জাতিগত মানসিকতার পরিবর্তন দরকার। সামাজিক মূল্যায়নের পরিবর্তন দরকার। তা না হলে দেশ উন্নত হবে না।
দেশেও নার্সিংয়ের অনেক চাহিদা রয়েছে। কিন্তু আমরা ভালো নার্স পাচ্ছি না। নার্সিংয়ের মান খুবই নিম্নমানের। এ খাতের উন্নতি না হলে আমরা জাতি হিসেবে নিজেরা নিজেদের সেবা দিতে পারব না। আমাদের হাসপাতালের মান কেন এত খারাপ। কেন আমাদের চিকিৎসা নিতে সিঙ্গাপুরে যেতে হয়? কেন আমরা নিজেদের বিকশিত করতে পারি না, সেটি ভাবতে হবে।
ব্যক্তি পর্যায়ে থেকে জাতীয় পর্যায়ে আমাদের সম্ভাবনা অনেক। সম্ভাবনাগুলোকে অনুধাবন করতে হবে। বাংলাদেশ আজ যে অবস্থায় আছে, সেটি আগের অবস্থা থেকে ভালো। তবে আমরা আরো ভালো করতে পারতাম। সেটি নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই; কিন্তু আমরা পারিনি।
ব্যক্তিগত, জাতিগত কিংবা সরকারি পর্যায়ে একসঙ্গে উন্নতি করতে হবে। এ উন্নতি একসঙ্গে না করলে হবে না। এক্ষেত্রে সরকারের প্রতিশ্রুতি তো অবশ্যই রয়েছে। প্রবাসীরা দেশে বিনিয়োগ করবেন, সেটি আমরা চাই। শুধু রেমিট্যান্সের টাকা পাঠালে গ্রামীণ অর্থনীতির পরিবর্তন হবে, নিজেদের উন্নতি হবে, বাড়ি-গাড়ি হবে। কিন্তু সামগ্রিকভাবে দেশের বড় কোনো উন্নতি হবে না। তার সঙ্গে আরো কোন কোন জায়গায় আপনারা বিনিয়োগ করতে পারেন তা অনুসন্ধান করতে পারেন। কীভাবে বন্ডে বিনিয়োগ বাড়ানো যায় সেটিও চিন্তা করতে পারেন। আমিও আমার জায়গা থেকে বিষয়টি দেখব। ওয়েজ আর্নার্স বন্ড কীভাবে বিদেশ থেকেই কেনা যায় সেটি নিয়েও কাজ করা হবে। প্রযুক্তির উৎকর্ষের এ যুগে নিরাপত্তা ঠিক রেখেই এগুলো আমরা করতে পারি। তা করতে পারলে আপনাদের (প্রবাসীদের) বাংলাদেশের সঙ্গে আরো বেশি সম্পৃক্ত করতে পারব। এটিই মূল লক্ষ্য। আপনাদের মধ্যে এই চাওয়া থাক, বাংলাদেশ থেকে আমাদের মধ্যেও এটিই চাওয়া রয়েছে। তাহলে ব্যক্তি থেকে সরকারি পর্যায়ে যে আকাঙ্ক্ষা রয়েছে সেটি পূরণ হবে। সবাইকে এক হয়ে দেশকে ভালো রাখতে কাজ করতে হবে। সবার সম্পৃক্ততার মধ্য দিয়ে দেশকে এগিয়ে নিতে হবে।
আহসান এইচ মনসুর: গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক
বণিক বার্তা আয়োজিত ‘বাংলাদেশ রেমিটার্স সম্মাননা ২০২৫ সিঙ্গাপুর’ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে